চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ

Baizid Bostami-4210, Chattogram Cantonment, Chattogram , Bangladesh.

CCPC - অধ্যক্ষ মহোদয়ের বিশেষ বার্তা

সন্মানিত অভিভাবক,

আসসালামু আলাইকুম।

বিশ্বময় কোভিড ১৯ মহামারী পরিস্থিতির মাঝে আশাকরি আপনারা সপরিবারে সুস্থ আছেন।

চলমান লকডাউনের মাঝে আমরা হাজার সমস্যায় জর্জরিত। এর মাঝেই সম্ভবত, আমরা সবচেয়ে বড় সমস্যায় ভুগছি সন্তানদের নিয়ে। বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ, পরীক্ষার অনিশ্চয়তা, অনলাইন ক্লাস, প্রাত্যহিক রুটিন লাইফের ব্যাপক পরিবর্তন, সার্বক্ষণিক বাসায় বসে সন্তানের বিরক্ত হওয়া, সর্বোপরি সন্তানদের পড়াশোনার বিষয়গুলো এলোমেলো অবস্থায় বিরাজ করছে। ফলে বাসায় বাচ্চাদের একধরনের মানসিক সমস্যা হওয়া খুবই স্বাভাবিক।

বাড়ন্ত সন্তানদের মাঝে একটা বড় প্রাণশক্তি বিরাজ করে। এই শক্তিটা তারা ব্যয় করতে চায়। স্বাভাবিক সময়ে - স্কুলে যাবার প্রস্তুতি, ক্লাসে অংশগ্রহণ, মাঠে খেলাধুলা, বন্ধুদের সাথে আলাপন, হৈ-হুল্লোড় ইত্যাদির ইতিবাচকতা ব্যাপক - এবং যাতে সন্তানেরা যথেষ্ট প্রাণশক্তি ব্যয় করে। এখন এই লকডাউনের মাঝে আমাদের সবাইকে গৃহবন্দী থাকতে হচ্ছে। আমরা যারা প্রাপ্ত বয়স্ক, তারা জানি এধরনের পরিস্থিতিতে আমাদের কোন অপসন নেই। ফলে আমরা বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছি। কিন্ত আমাদের সন্তানদের বর্ধিষ্ণু বয়সে বিষয়টি মেনে নেয়া খুবই দুঃসাধ্য। ফলে তাদের মাঝে সৃষ্টি হচ্ছে একঘেয়েমি মনোভাব, বিরক্তিকর আচরণ, ঘরের ভেতর অস্বাভাবিক কার্যকলাপ। অর্থাৎ, সন্তানের যে প্রাণশক্তি স্কুলে ব্যয় হতো, তা যেহেতু ব্যয় হচ্ছেনা - তাই ঘরে সৃষ্টি হচ্ছে সংঘাতময় পরিবেশ। ঘরে ছোটাছুটি, ঠিক সময়ে পড়তে না বসা, কথা না শোনা - এই ধরনের অস্থির ব্যবহার আমরা দেখতে পাচ্ছি সন্তানদের মাঝে।

সন্তানের কাছে আদর্শ ব্যক্তি / চরিত্র হচ্ছে তার বাবা অথবা মা। লকডাউনের মাঝে সন্তান যদি দেখে, তার পিতা-মাতা অধিকাংশ সময় ব্যয় করছে স্মার্টফোন, টিভি অথবা স্বামী-স্ত্রী কলহে; তাহলে বিষয়টি "অকার্যকর পারিবারিক পটভুমি" তে পর্যবসিত হতে বাধ্য। মানসিক বিজ্ঞানের ভাষায়, আপনি যদি নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করেন বা ইতিবাচক কিছু করেন, তবে আপনি আপনার সন্তানের মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়তা করতে পারেন। এটাই প্রকৃত সাফল্য।

এখন প্রশ্ন আসতেই পারে, কিভাবে আমরা এই অচল পরিস্থিতি মোকাবেলা করব? অথবা, এই
"অকার্যকর পারিবারিক পটভুমি" হতে উত্তরণের উপায় কী? আমাদের অবশ্যই এ বিষয়গুলোতে সচেতন হতে হবে। বাসার পরিবেশ সন্তানের মনোবৃত্তির সহায়ক হতে হবে। সেটা কিরকম?

# নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন
# আমি নয় - আমরা বলুন
# সন্তানেরা যখন তাদের কর্মকাণ্ড দিয়ে আমাদের পাগল করে তোলে, তখন ইতিবাচক থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রায়ই আমরা একটি কথা বলে শেষ করি – “এটা করা বন্ধ কর”! তবে আমরা যদি তাদের ইতিবাচক নির্দেশনা দেই এবং তারা কাজটি ঠিকঠাক করতে পারলে যদি তাদের প্রশংসা করি, তাহলে আমরা যা করতে বলবো তারা সেটা করতেই বেশি আগ্রহী থাকবে।
# হতে পারে আমরা অফিসে যাচ্ছি না, কিন্তু সঠিক সময়ে ঘুম থেকে ওঠা, সঠিক সময়ে নাস্তা, প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ড এবং অবশ্যই সন্তানের সাথে "গুণগত সময়" পার করা।
# এই "গুণগত সময়" মানে শুধু এই নয় যে - সন্তানকে জোড়করে ধরে পড়াশোনা করানো। "গুণগত সময়" হতে পারে - ইনডোর গেমস, দাবা, মুভি, গল্পের বইপড়া, আবৃত্তি, ছবি আঁকা, অনলাইন ক্লাসে পাশে বসা ইত্যাদি। অর্থাৎ পড়াশোনা কে তিক্ততার পর্যায়ে না নিয়ে - সৃজনশীল পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে সার্বিকভাবে বিষয়টাকে সহনীয়তার মাঝে রাখা।
# অনলাইনে আপনার শিশুদের সুরক্ষার জন্য
‘প্যারেন্টাল কন্ট্রোল’ নিয়ন্ত্রণে রাখুন। আপনার ব্রাউজারে ‘সেইফসার্চ’ অপশনটি চালু করুন। অনলাইন অ্যাপ্লিকেশন ও গেমগুলোতে কঠোর গোপনীয়তা সেটিংস চালু করুন। ওয়েবক্যামগুলো যখন ব্যবহার না হয় তখন সেগুলোকে ঢেকে রাখুন। আপনার সন্তানকে বলুন, তারা যদি অনলাইনে এমন কোনো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয় যা তাদের জন্য বিরক্তি, অস্বস্তি বা ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, সেক্ষেত্রে তারা বিষয়টি নিয়ে আপনার সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারে এবং আপনি এ জন্য রাগ করবেন না বা তাদের শাস্তি দেবেন না।
# সন্তানের একাডেমিক উন্নয়নের পাশাপাশি তার মূল্যবোধের উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরী। প্রাচুর্যের মাঝে আজকের শিশুরা সব কিছু তার অধিকার মনে করে। কিছু পেতে হলে তা তাকে অর্জন করতে হবে - এ বিষয়টা শেখানো প্রয়োজন। পড়ার রুম, পড়ার টেবিল গোছানোর দায়িত্ব সন্তানদের দিন। বাসার প্রাত্যহিক কাজে সন্তানের অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করুন, যাতে সে অনুধাবন করে, "কোনো কাজই হীন নয়"। বিভিন্ন উদাহরণের মাধ্যমে সততা, সময়ানুবর্তিতা, শ্রদ্ধাবোধ, পরিমিতিবোধ, শুদ্ধাচার, পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি সন্তানের সাথে আলোচনা করুন। তাহলে আজকের সন্তান অনাগত দিনে, যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে বাস্তব জীবনের মুখোমুখি হবে।

যখন আমরা শান্তিপূর্ণ সম্পর্কের 'আদর্শ' হই, তখন আমাদের সন্তানরা আরও 'সুরক্ষিত এবং ভালোবাসা-সিক্ত' বোধ করে। ইতিবাচক ভাষার ব্যবহার, ধৈর্য নিয়ে কথা শোনা এবং সহানুভূতি এই "চাপের সময়ে" শান্তিপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশ বজায় রাখতে সহায়তা করবে। আপনার পছন্দ নয় এমন কাজ থেকে তাদের বিরত থাকতে না বলে বরং তারা কোনো কাজ করলে আপনার ভালো লাগবে সেটা তাদের বলুন। “চিৎকার করা বন্ধ করো” এভাবে না বলে বরং “দয়া করে আরও আস্তে কথা বলো” এভাবে বলতে চেষ্টা করুন।

আমি, আমার - শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ, এই কোভিড মহামারী হতে দ্রুত উত্তরণের নিমিত্তে স্রষ্টার নিকট কায়মনোবাক্যে দোয়া করছি। সত্যি বলতে, একটা লম্বা সময় ধরে ছাত্র-ছাত্রী বিহীন ক্যাম্পাসে থেকে আমরাও চাতক চোখে অপেক্ষার প্রহর গুনছি। এই অস্থির সময়ের শেষ একদিন হবেই।

আমরা করবো জয় একদিন।।

শুভকামনায় -

কর্নেল মুজিবুল হক সিকদার
প্রিন্সিপাল
চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ।
২৪.০৪.২১.

Your web browser doesn't have a PDF plugin. Instead you can click here to download the PDF file.